সোমবার ২৬, অক্টোবর ২০২৬

সোমবার ২৬, অক্টোবর ২০২৬ -- : -- --

সালমান শাহর মৃত্যু : ৩০ বছর পর কি মিলবে সেই রহস্যের জট?

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৭ পিএম

55

জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুরহস্য ৩০ বছরেও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। তিনি হত্যার শিকার হয়েছিলেন, নাকি আত্মহত্যা করেছিলেন—এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলে আসছে। তবে গত বছরের অক্টোবরে এ ঘটনায় হত্যা মামলা হওয়ার পর তদন্তে নতুন করে তৎপরতা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে গত ৯ আগস্ট খল অভিনেতা আশরাফুল হক ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলার অন্য আসামিদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

বাদীপক্ষের আইনজীবীর দাবি, সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় তাদের হাতে বেশ কিছু তথ্য-প্রমাণ এসেছে। প্রযুক্তির সহায়তায় বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে এসব তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে ঘটনার প্রামাণ্য ভিত্তি তৈরি করার চেষ্টা চলছে। আদালতে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ প্রমাণ করা সম্ভব হবে বলেও আশাবাদী তারা।

যেভাবে মৃত্যু হয় সালমান শাহর

১৯৯৬ সালে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা অবস্থায় রহস্যজনক মৃত্যু হয় শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন ওরফে সালমান শাহর। ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটন রোডের একটি ফ্ল্যাট থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

ময়নাতদন্ত করেন চিকিৎসক ডা. তেজেন্দ্র চন্দ্র দাস। তাঁর প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ফাঁসের কারণে শ্বাসরোধকে উল্লেখ করা হয় এবং ঘটনাটিকে আত্মহত্যাজনিত বলে মত দেওয়া হয়। পরে এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা করা হয়।

তবে শুরু থেকেই সালমান শাহর স্বজনরা দাবি করে আসছেন, এটি আত্মহত্যা নয়, তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।

একাধিক সংস্থার তদন্ত

সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে দীর্ঘ সময়ে থানা পুলিশ, মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করেছে।

বিভিন্ন সময়ের তদন্ত প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সর্বশেষ ২০২১ সালে পিবিআইয়ের দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরোধিতা করে নারাজি দেন সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী। পরে তাঁর রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করে আদালত এ ঘটনায় হত্যা মামলা করার নির্দেশ দেন।

এর ধারাবাহিকতায় গত বছরের ২১ অক্টোবর নীলা চৌধুরীর পক্ষে তাঁর ভাই আলমগীর কুমকুম রাজধানীর রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে সিআইডি।

মামলায় যারা আসামি

মামলায় আসামি করা হয়েছে সামিরা হক, লতিফা হক লুছি, আশরাফুল হক ডন, আজিজ মোহাম্মদ ভাই, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু ও রেজভী আহমেদ ফরহাদকে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।

গত ৯ আগস্ট আশরাফুল হক ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তাদের আশা, তাঁর কাছ থেকে মামলার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

সিআইডি ঢাকা মহানগর দক্ষিণের পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মজিবুর রহমান জানান, গুরুত্বের সঙ্গে মামলাটির তদন্ত চলছে। ডনের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার আশা রয়েছে। একই সঙ্গে মামলার অন্য আসামিদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

নীলা চৌধুরীর প্রত্যাশা

সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী মনে করেন, মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তাঁর ছেলে কীভাবে মারা গেছেন, সে বিষয়ে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।

তিনি দীর্ঘদিন ধরে সালমান শাহর মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড দাবি করে আসছেন। তাঁর প্রত্যাশা, এবার তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসবে এবং তিনি তাঁর সন্তানের হত্যার বিচার পাবেন।

আইনজীবীর দাবি, হাতে এসেছে নতুন তথ্য-প্রমাণ

সালমান শাহ হত্যা মামলায় বাদীপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহমেদের দাবি, তিন দশক আগের ঘটনা হওয়ায় এ মামলায় পারিপার্শ্বিক বা সারকামস্টানসিয়াল এভিডেন্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সালমান শাহর মৃত্যুর সময়কার ডন ও সামিরার কিছু ছবি তাঁদের হাতে এসেছে। ছবিগুলোর আলোকচিত্রীকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। ওই ব্যক্তি ছবিগুলোর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারেন বলে মনে করছেন তাঁরা।

এ ছাড়া সামিরা ও ডনের কথোপকথনের কিছু রেকর্ডও তাঁদের হাতে রয়েছে বলে দাবি করেছেন আইনজীবী। বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে এসব ছবি ও রেকর্ড যাচাই করে প্রয়োজনীয় তথ্য নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

তবে আইনজীবীর অভিযোগ, মামলার তদন্তে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তাঁদের প্রত্যাশিত সহযোগিতা করছে না। যদিও সিআইডির তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

রেজভীর ‘স্বীকারোক্তি’ ঘিরে বিতর্ক

সালমান শাহ হত্যা মামলার তদন্তে একসময় নতুন করে আলোচনায় আসে ফরহাদ আহমেদ রেজভীর নাম। পুলিশ জানিয়েছিল, তিনি হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। ওই বক্তব্যের ভিত্তিতে তদন্তে নতুন মোড় আসে।

তবে পরবর্তী সময়ে সিআইডি ও পিবিআইয়ের তদন্তে ওই জবানবন্দিকে সাজানো বলে উল্লেখ করা হয়।

প্রবাসী রেজভী অবশ্য দাবি করেছেন, নীলা চৌধুরীর অনুরোধে তাঁকে মিথ্যা জবানবন্দি দেওয়ার জন্য রাজি করানো হয়েছিল। তাঁর দাবি, সালমান হত্যার বিচার সহজ হবে—এমন কথা বলে তাঁকে বোঝানো হয়। তিনি রাজি হওয়ার পর তাঁকে থানা ও আদালত চত্বরে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর কোনো জবানবন্দি নেওয়া হয়নি। পরে তাঁকে জবানবন্দি দিয়েছেন বলে উল্লেখ করে হত্যাকাণ্ডে জড়িত হিসেবে কারাগারে পাঠানো হয়।

এবার কি মিলবে রহস্যের সমাধান?

সালমান শাহর মৃত্যুর তিন দশক পেরিয়ে গেলেও রহস্যের পুরোপুরি সমাধান হয়নি। দীর্ঘদিনের তদন্ত, একাধিক প্রতিবেদন এবং আত্মহত্যা-হত্যা নিয়ে পরস্পরবিরোধী দাবির পর নতুন হত্যা মামলাকে ঘিরে আবারও আলোচনায় এসেছে বিষয়টি।

সিআইডির বর্তমান তদন্ত, গ্রেপ্তার হওয়া আশরাফুল হক ডনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য এবং বাদীপক্ষের হাতে থাকা কথিত নতুন তথ্য-প্রমাণ শেষ পর্যন্ত কী ফল দেয়—এখন সেটিই দেখার বিষয়।

তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত মামলায় উত্থাপিত অভিযোগগুলো অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হবে।

Link copied!