প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২৪ এএম
42
সোমবার ২৬, অক্টোবর ২০২৬ -- : -- --
চাঁদপুরের বহুল আলোচিত ইউপি চেয়ারম্যান ও চলচ্চিত্র প্রযোজক সেলিম খান এবং তাঁর চিত্রনায়ক ছেলে শান্ত খানের মৃত্যুর ২৬ মাস পর নতুন করে তদন্তের দ্বার খুলেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন গণপিটুনিতে নিহত বাবা-ছেলের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়েছিল। এবার আদালতের নির্দেশে তাঁদের মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) সকাল ৮টার দিকে চাঁদপুর সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের কবরস্থান থেকে প্রথমে সেলিম খানের মরদেহ উত্তোলন করা হয়। পরে তাঁর ছেলে শান্ত খানের মরদেহও উত্তোলন করা হয়। এ সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রত্যয় হাশেম, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চাঁদ মিয়াসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
দীর্ঘ দুই বছর দুই মাস দুই দিন পর কবর থেকে মরদেহ উত্তোলনের এই ঘটনা চাঁদপুরে নতুন করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ৫ আগস্টের সহিংসতার ওই দিনের ঘটনাপ্রবাহ, সেলিম খান ও তাঁর ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত পরিস্থিতি এবং তাঁদের মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় এলাকা ছাড়ার চেষ্টা করার সময় জনতার গণপিটুনিতে সেলিম খান ও তাঁর ছেলে শান্ত খান নিহত হন। পরে তাঁদের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে চাঁদপুর সদর মডেল থানায় মামলা করে। মামলার তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আদালত মরদেহ দুটি উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের নির্দেশ দেন।
চাঁদপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফয়েজ আহমেদ জানান, আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পর মরদেহ উত্তোলনের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করা হয়। জেলা প্রশাসকের অনুমোদনের পর বুধবার আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী মরদেহ দুটি উত্তোলন করা হয়েছে।
দীর্ঘ সময় পর মরদেহ উত্তোলনের বিষয়ে চাঁদপুরের সিভিল সার্জন মোহাম্মদ নূর আল দীন বলেন, মামলার তদন্তের স্বার্থে অনেক সময় দীর্ঘদিন পরও কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন করা হয়। শরীরের মাংসপেশি নষ্ট হয়ে গেলেও ময়নাতদন্তের ক্ষেত্রে অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা সম্ভব। সেলিম খান ছিলেন চাঁদপুর সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও পরিবেশনা প্রতিষ্ঠান ‘শাপলা মিডিয়া’র স্বত্বাধিকারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর ছেলে শান্ত খানও চলচ্চিত্রে অভিনয় করতেন।
তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে সেলিম খানকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ ও বিতর্ক ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে ওঠে। চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণ ঘিরে অনিয়মের অভিযোগেও তাঁর নাম আলোচনায় আসে। এসব অভিযোগের কারণে বিভিন্ন মহলে তিনি ‘বালুখেকো চেয়ারম্যান’ হিসেবে পরিচিতি পান।
তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও রাজস্ব-সংক্রান্ত একাধিক মামলা এবং কারাবাসের তথ্যও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি ও সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর চূড়ান্ত ফল পৃথক আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণপিটুনিতে সেলিম খান ও শান্ত খানের মৃত্যু এবং পরবর্তী সময়ে ময়নাতদন্ত ছাড়াই তাঁদের দাফন—দুই ঘটনাই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘ ২৬ মাস পর মরদেহ উত্তোলনের ফলে তদন্তকারীরা মৃত্যুর ধরন, আঘাতের চিহ্নসহ ময়নাতদন্তে সম্ভবপর অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণের সুযোগ পাচ্ছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় মরদেহের স্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটলেও আদালতের নির্দেশে ময়নাতদন্তের মাধ্যমে যতটুকু সম্ভব তথ্য ও আলামত সংগ্রহ করা হবে। সেই তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, মামলার নথি এবং অন্যান্য তদন্ত-উপাদান মিলিয়ে ৫ আগস্টের ওই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র বের করার চেষ্টা করা হবে।
ফলে ২৬ মাস পর কবর থেকে দুই মরদেহ উত্তোলন শুধু একটি ময়নাতদন্তের আনুষ্ঠানিকতা নয়; ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আলোচিত ওই মৃত্যুরহস্য ও ঘটনার আইনি দায় নির্ধারণে এটি তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন ধাপ।