সোমবার ২৬, অক্টোবর ২০২৬

সোমবার ২৬, অক্টোবর ২০২৬ -- : -- --

সড়ক প্রশস্তকরণের প্রকল্প নেই, তবু সাড়ে চার হাজার গাছ কাটার অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২২ আগস্ট ২০২৬, ০৭:০৭ পিএম

59

সুনামগঞ্জ-সাচনা সড়কের প্রায় ১৯ কিলোমিটার এলাকায় সাড়ে চার হাজার গাছ কাটার কাজ শুরু হয়েছে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের অধীনে থাকা এ সড়কে গাছ কাটছে বন বিভাগ। তবে সওজ জানিয়েছে, সড়কটি প্রশস্ত করার কোনো প্রকল্প নেওয়া হয়নি এবং গাছ কাটার কারণও তাদের জানা নেই।

গাছ কাটার ঘটনায় ক্ষোভ দেখা দিয়েছে স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে। শনিবার সুনামগঞ্জ জেলা হাওর ও নদীরক্ষা আন্দোলনের উদ্যোগে সড়কের ইচ্ছারচর এলাকায় মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অবিলম্বে গাছ কাটা বন্ধের দাবি জানানো হয়। অন্যথায় বন অফিস ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি দেন আন্দোলনকারীরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদেশি প্রজাতির গাছ কাটার কথা বলা হলেও সড়কের পাশে থাকা দেশীয় ফলদ ও ছায়াবৃক্ষও কেটে ফেলা হচ্ছে। ইচ্ছারচর গ্রামের বাসিন্দা মানিক মিয়া জানান, তাঁর বাড়ির সামনে থাকা একটি জামগাছ তিনি নিজেই লাগিয়েছিলেন। গাছটির ছায়ায় শিক্ষার্থী ও পথচারীরা বিশ্রাম নিতেন এবং মৌসুমে স্থানীয়রা জাম খেতেন। বাধা দেওয়ার পরও গাছটি কেটে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর।

একই গ্রামের আবুল হোসেন বলেন, কোনো কারণ ছাড়াই সড়কের পাশের শত শত গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। আকাশমণি ও রেইনট্রিসহ বিদেশি প্রজাতির গাছ কাটার দরপত্র হয়েছে বলে শুনেছেন তিনি। কিন্তু এর সঙ্গে দেশীয় গাছও কাটা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

হাওর ও নদীরক্ষা আন্দোলনের নেতারা জানান, ৮৪ লাখ ৮০ হাজার টাকায় ৪ হাজার ৪৬৮টি গাছ বিক্রি করা হয়েছে। এসব গাছের কাঠের বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা হতে পারে বলেও দাবি করেন তারা। এতে সরকার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন আন্দোলনকারীরা।

সংগঠনের সভাপতি রাজু আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গাছ কাটা বন্ধ না হলে বন অফিস ঘেরাও করা হবে।

স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় সুনামগঞ্জ-সাচনা সড়কের দুই পাশে প্রায় ২০ হাজার গাছ লাগানো হয়। স্থানীয় উপকারভোগীরা দীর্ঘদিন ধরে এসব গাছের পরিচর্যা করে আসছেন।

এর আগে ২০২৪ সালে একই সড়কের প্রায় ৩ হাজার গাছ কাটার জন্য দরপত্র আহ্বান করেছিল বন বিভাগ। স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে তখন গাছ কাটা হয়নি।

হাওর ও নদীরক্ষা আন্দোলনের সভাপতি রাজু আহমেদ বলেন, ২০২৫ সালে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) করা একটি রিটের পর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ সামাজিক বনায়ন বিধিমালা, ২০০৪-এর আওতায় রোপণ করা গাছ না কেটে গাছের বাজারমূল্য নির্ধারণ করে নির্বাচিত উপকারভোগীদের অর্থ দেওয়ার বিধান যুক্ত করার নির্দেশ দেন। একই রায়ে সামাজিক বনায়নের গাছ কাটার ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের কমিটির অনুমোদনের বিষয়টিও আসে বলে জানান তিনি। সুনামগঞ্জ জেলা বন কর্মকর্তা রিয়াজ উদ্দিন বলেন, গাছ কাটার অনুমোদন জেলা কমিটিতে হয়েছে।

তবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মতিউর রহমান খান বলেন, বর্তমান জেলা প্রশাসকের দায়িত্বকালে, অর্থাৎ গত তিন-চার মাসে এ ধরনের কোনো অনুমোদন হয়নি। এর আগে অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র ও ফাইল দেখে বিষয়টি নিশ্চিত হতে হবে বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সাজেদুর রহমান বলেন, সুনামগঞ্জ-সাচনা সড়ক প্রশস্ত করার কোনো প্রকল্প নেওয়া হয়নি। গাছ কাটার বিষয়েও সওজ কিছু জানে না। বন বিভাগ থেকে শুধু গাছ কাটার দরপত্রের একটি কপি তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে।

সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রহমান বলেন, সড়কের পাশে সামাজিক বনায়নের আওতায় প্রায় সাড়ে চার হাজার গাছ রয়েছে। সামাজিক বনায়নের নিয়ম অনুযায়ী, বাগানের বয়স ১০ বছর পূর্ণ হলে গাছ কাটার পর সদস্যদের মধ্যে লভ্যাংশ বিতরণ এবং পরে সেখানে নতুন করে বনায়ন করার বিধান রয়েছে।

তিনি বলেন, সামাজিক বনায়নের সদস্যদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই গাছ কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।

সড়কের পাশে আকাশমণিসহ বিভিন্ন বিদেশি প্রজাতির গাছ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বন সংরক্ষণ আইন, ২০২৬ অনুযায়ী এসব গাছের পরিবর্তে নতুন করে দেশীয় প্রজাতির গাছ রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তবে দেশীয় প্রজাতির গাছও কাটা হচ্ছে—এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, দেশীয় প্রজাতির গাছ কাটা হবে না।

সামাজিক বনায়নের গাছ না কেটে উপকারভোগীদের সরকার ক্ষতিপূরণ দেবে—আদালতের এমন নির্দেশনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আলোচনায় ছিল। তবে এখনো এ বিষয়ে সরকারের কোনো গেজেট বা চূড়ান্ত নির্দেশনা বন বিভাগ পায়নি। সরকার এ ধরনের নির্দেশনা দিলে বন বিভাগ তা অনুসরণ করবে।

সড়ক প্রশস্ত করার কোনো প্রকল্প না থাকা সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক গাছ কাটার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। গাছ কাটা বন্ধে আন্দোলনকারীরা দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।

Link copied!